হিন্দিতে চিপকো শব্দটির অর্থ “আলিঙ্গন করা”/
“আটকে থাকা” হলেও একটি আন্দোলনের সাথে এর সম্পৃক্ততা কোথায় এবং কেন সেটা ভেবে সামান্য অবাক হতে হয়।
তাহলে ঘুরে আসা যাক দুই শতাব্দীর আগের সেই পুরুষ নির্মিত নারী প্রতিমূর্তি পদ্মাবতীর ঊষর ভূমি থেকে। মোঘল শাসন পার করে ক্রমেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তার হচ্ছে। মাড়োয়ার যোধপুরের সিংহাসনে রাজা হয়ে এসেছেন রাজপুত অভয় সিং। প্রাসাদ আর ইমারতের রাজপুতনায় নতুন কেল্লা বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি, যাতে প্রয়োজন হল প্রচুর কাঠের।
সময়টা ১৭৩০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোন এক মঙ্গলবার। রাজাজ্ঞা মাথায় নিয়ে যোধপুর থেকে ২৬ কিমি দূরে বিষ্ণোই’এর খেজার্লি গ্রামে এসে হাজির হলেন মারওয়ার রাজ্যের মন্ত্রী গিরিধার ভাণ্ডারী। ঘোষণা দিলেন, রাজপ্রাসাদের নির্মাণকাজের জন্য কাটা হবে গ্রামের কিছু গাছ। এখানকার শক্তপোক্ত খেজরি গাছ এনে বানানো হবে কেল্লা। গ্রামটি ছিলো বিষ্ণোই সম্প্রদায় অধ্যুষিত, নামমাত্র জলে জন্মানো খেজরি গাছ থেকে পাওয়া বিন জাতীয় ফলই ছিল যাদের আহার্য, জলহীন এই রাজপুতনায় যারা ছিলেন প্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে বাঁচাতেই বিশ্বাসী। রাজ্যবিস্তারের পরম্পরার উল্টোপথে হেঁটে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে বাঁচার দর্শনে গাছ কাটার পথে সেদিন রুখে দাঁড়ায় খেজার্লি গ্রাম। মন্ত্রীর ঘোষণার বিরুদ্ধে সেদিন প্রতিবাদ করেছিলেন সে গ্রামেরই অমৃতা দেবী।
টানা ১০ দিন রাজপুত সেনার সামনে অস্ত্রহীন প্রতিরোধে সামিল হয় ৮৩টি বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের অর্ধসহস্র বিষ্ণয়ী।
রাজসেনার চেষ্টা বিফলে যাওয়ায় অজয় সিংয়ের ক্রোধ বেড়ে যায়। যে কোনো মূল্যে গাছ কেটে আনার নির্দেশ দেন তিনি। শেষে ১০ দিনের প্রতিরোধের পর একদিন সকালে রাজপুত সেনা আসতে দেখে গাছ জড়িয়ে ধরেছিলেন মধ্যবয়সী অমৃতাদেবী। সঙ্গে তাঁর তিন মেয়ে আসু, রত্নি ও ভাগু। কী সেই জীবনবোধ! গাছকে বুকে জড়িয়ে অমৃতা দেবী সেদিন দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠেছিলেন,
“সার সন্ঠে রুখ জায়ে, তো ভি সাস্তো জান।”
যার মর্মার্থ, একটি মাথার বিনিময়ে হলেও যদি একটি গাছ বাঁচানো যায়, তবে তা-ই সই। ঘুষ দিয়ে তাকে মানানোর চেষ্টা করা হলেও, অমৃতা ছিলেন আপোসহীন।
নাছোর মা ও মেয়েদের মতই ধীরে ধীরে গাছ জড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষজন। ফলস্বরূপ মানুষ কুপিয়ে একে একে কাটা হয় খেজরি গাছ। সেদিন মাড়োয়ার রাজ্যের রাজপুত ক্রোধের বলি হয় ৩৬৩ জন প্রকৃতিপ্রেমী বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ। ১৭৩০-এর বৈষ্ণোইদের এই আন্দোলন আধুনিক ইতিহাসের প্রথম পরিবেশ আন্দোলন বলে ধরা হয়।
এই পটভূমি ধরেই আজ থেকে ৪৭ বছর আগে ১৯৭৩ সালে শুরু হয়েছিল “চিপকো আন্দোলন”। গাছ কাটা বন্ধের জন্য গাছকে আলিঙ্গন করার মধ্য দিয়ে এক অহিংস আন্দোলনে নেমে পড়েছিলেন স্বাধীন ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের গ্রামবাসী।
কারখানা স্থাপনের জন্য তৎকালীন আমলাদের ১০০ গাছ কাটার উদ্যোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান গ্রামেরই দুই যুবক সুন্দরলাল বহুগুনা ও চন্ডীপ্রসাদ ভট্ট। গাছকে জড়িয়ে ধরে তারাও এর বিরোধিতা করেছিলেন।
১৯৭৪ সালে সরকার কর্তৃক ২,০০০ গাছ কাটা হলে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং সুন্দরলাল বহুগুনা গ্রামে গ্রামে গিয়ে নারী, পুরুষ, ছাত্রদের এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানান। ১৯৭২-৭৯ সালের মধ্যে দেড় শতাধিক গ্রাম চিপকো আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিল। উত্তরাখণ্ডে ১২টি বড় ও ছোটখাট অনেক বিক্ষোভ হয়।
এ আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন গৌড়া দেবী, সুদেশা দেবী, বাচ্চনি দেবী, চন্ডী প্রসাদ ভট্ট, ধুম সিং নেজি, শমসের সিং, গোবিন্দ সিং রাওয়াত প্রমুখ। উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে সরকার থেকে করাত কল মালিকদের ওপর গাছ কাটার আদেশ আসলে সেই অঞ্চলের আদিবাসী গৌরি দেবী তার সঙ্গীদের নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন।
এই আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় নেতা সুন্দরলাল বহুগুণা ১৯৮১-৮৩ সালে চিপকো আন্দোলনের খবর পৌঁছে দিতে প্রায় ৫,০০০ কিলোমিটার পদযাত্রা করেছিলেন। ২০০৯ সালে পদ্মবিভূষণ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি। ভারতের অসামরিক সর্বোচ্চ সম্মান পেয়েও তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। এই বিষয়ে তার যুক্তি ছিল, যতদিন না ভারতে সবার মধ্যে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ততদিন তিনি এই পুরস্কার নিতে পারবেন না।
অমৃতা দেবীর হাত ধরে শুরু হওয়া সেই আন্দোলনই পরবর্তীতে চিপকো আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সফল অংশগ্রহণ এবং অহিংসতাই এনে দিয়েছিল চিপকো আন্দোলনের সফলতা।